HomeUncategorizedমামলার আলামত নষ্টের অভিযোগ: বগুড়ায় ওসি কৃপা সিন্ধুর বিচার দাবিতে রাস্তায় স্কুলছাত্রীর...

মামলার আলামত নষ্টের অভিযোগ: বগুড়ায় ওসি কৃপা সিন্ধুর বিচার দাবিতে রাস্তায় স্কুলছাত্রীর মা

print news

মোঃ রাশেদ,বগুড়াঃ

ধর্ষণের বিচার চেয়ে গতবছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি দিয়েছিল বগুড়ার ধুনটের এক স্কুলশিক্ষার্থী। তাকে ধর্ষণের প্রমাণ মেলে মেডিকেল পরীক্ষায়। আসামিও স্বীকারোক্তি দিয়েছেন আদালতে। কিন্তু ধর্ষণের সময় ধারণ করা ভিডিও নষ্ট করেন থানার ওসি। সেটিও পিবিআইয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়।

বছর ঘুরে এলো। মামলা আর এগোচ্ছে না। ধর্ষণের আলামত ধ্বংসকারী সেই পুলিশ কর্মকর্তাও দিব্বি আছেন বহাল তবিয়তে। বগুড়া থেকে বদলির পর পাবনা সদর থানার ওসি হয়েছেন। আর বিচারের জন্য মামলার চার্জশিটের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন নির্যাতনের শিকার ছাত্রীর বাবা-মা। এমন হতাশা নিয়ে গতকাল শনিবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে বগুড়া শহরের সাতমাথায় অবস্থান নেন ভুক্তভোগীর মা। প্রায় এক ঘণ্টা তিনি সাতমাথায় অবস্থান করে বিচারের দাবি জানান।

ওই স্কুলছাত্রীর মায়ের ভাষ্য, মেয়েকে ধর্ষণের আলামত নষ্টকারী ধুনট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কৃপা সিন্ধু বালার নাম অভিযোগ থেকে বাদ দিলে মামলার চার্জশিট মিলবে। এমন অভিযোগ তুলে প্রতিকার পেতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের (আইজিপি) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন তিনি। একই আবেদনের একটি অনুলিপি দেওয়া হয় বগুড়ার পিবিআই কার্যালয়ে।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ৩ মার্চ বেলা ১১টার দিকে মেয়েটিকে নিজ ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করেন জালশুকা হাবিবর রহমান ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মুরাদুজ্জমান। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের কিছু আপত্তিকর দৃশ্যও মুঠোফোনে ধারণ করেন তিনি। এ ঘটনায় ওই প্রভাষকের বিরুদ্ধে ১২ মে সকালে ধুনট থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা। মামলার পর ওইদিন সন্ধ্যায় তাকে মুরাদুজ্জমানকে গ্রেফতার করা হয়। আর ১৯ মে প্রধানমন্ত্রী বরাবর নিজ হাতে চিঠি লেখে নির্যাতনের শিকার স্কুলছাত্রী।

পরবর্তীতে ওই বছরের ২ আগস্ট ধুনট থানার তৎকালীন ওসি কৃপা সিন্ধু বালার বিরুদ্ধে ধর্ষণের আলামত ধ্বংসের অভিযোগ করেন ওই ছাত্রীর মা। তিনি বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তীর কাছে লিখিত ওই অভিযোগ দেন। কিন্তু অভিযোগের পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় অসন্তুষ্ট হন ভুক্তভোগীর মা।

একপর্যায়ে ২৮ আগস্ট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে মামলা ও ওসির বিরুদ্ধে আলামত নষ্টের অভিযোগ তদন্তভার দেওয়ার দাবি জানান তিনি। তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের অক্টোবরে মামলার দায়িত্বভার নেন পিবিআই পরিদর্শক সেলিম মালিক। পরবর্তীতে ১ নভেম্বর থেকে মামলার তদন্ত করছেন এসআই সবুজ আলী।

আর ওসি কৃপা সিন্ধুর অভিযোগটি দেখছেন পিবিআই এসপি কাজী এহসানুল কবির। চলতি বছরের ৩০ মার্চ ওসির বিরুদ্ধে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় আইজিপির দপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দেন পিবিআই এসপি।

অভিযুক্ত ওসি কৃপা সিন্ধু বালা ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত বগুড়ার ধুনট থানার দায়িত্বে ছিলেন। রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল বাতেন সই করা এক অফিস আদেশে তাকে পাবনায় বদলি করা হয়। তিনি বর্তমানে পাবনা সদর থানার ওসি হিসেবে কর্মরত আছেন। পিবিআই এসপির প্রতিবেদন জমার পর প্রায় পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও মামলার আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরে ভুক্তভোগীর মা আইজিপি বরাবর অভিযোগ দেন।

অবস্থান কর্মসূচিতে মামলার বাদী বলেন, ‘কৃপা সিন্ধু বালার অপরাধ প্রমাণ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছে পিবিআই বগুড়ার কার্যালয়। তা সত্ত্বেও পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার উদ্ধার ফোন দুটি বিভিন্ন সময়ে একাধিক সংস্থায় ফরেনসিক করেছেন। ফরেনসিক শেষে ফোন দুটি এবছরের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বগুড়া কার্যালয়ে পাঠানো হয়।’

ভুক্তভোগী ছাত্রীর মা বলেন, ‘খবর পেয়ে মামলার সার্বিক অবস্থা জানার জন্য আমি ৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে বগুড়ার পিবিআইয়ের এসপি কাজী এহসানুল কবিরের কার্যালয়ে উপস্থিত হই। তিনি আমাকে জানান, পিবিআই বগুড়া ও পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের করানো ফরেনসিক রিপোর্টের ফলাফল একই এসেছে। সুতরাং পিবিআই বগুড়ার দাখিল করা প্রতিবেদনে কৃপা সিন্ধু বালাকে ফৌজদারি ও বিভাগীয় আইনের যে সমস্ত ধারায় অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছিল তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার মামলার মূল চার্জশিটে কৃপা সিন্ধু বালাকে বাদ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। এসপি কাজী এহসানুল কবির আমাকে কৃপাসিন্ধু বালা ব্যতীত চার্জশিট নেওয়ার প্রস্তাব করলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করে বাসায় চলে আসি।’

মামলা সংক্রান্ত নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৪ মে স্কুলছাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এর প্রায় দেড় মাস পর প্রতিবেদন দেওয়া হয়। বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মিজানুর রহমান, প্রভাষক মাকসুদুর রহমান আকন্দ ও রোকসানা খাতুন সই করা স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘আমরা সবাই একমত যে এখানে জোর কর যৌন সম্পর্ক স্থাপনের একাধিক চিহ্ন রয়েছে।’

মামলার বাদী স্কুলছাত্রীর মা বলেন, ‘মামলার শুরু থেকে ওসি কৃপা সিন্ধু বালা আমাদের সঙ্গে অন্যায় করে আসছেন। সঠিক চার্জশিট দেওয়ার জন্য তিনি সাত লাখ টাকার ঘুস দাবি করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে এক লাখ ২২ হাজার টাকা ঘুস নেন। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ওসি কৃপা সিন্ধু নিজেই নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আসামি মুরাদের সঙ্গে আপস করে ধর্ষণের আলামত নষ্ট করেন তিনি। আলামত হিসেবে জব্দ মোবাইল ফোন বেআইনিভাবে নিজের হেফাজতে নিয়ে ওই সময় বগুড়া সদর থানা, ছিলিমপুর ফাঁড়ি, আদমদিঘী থানায় পাঠিয়েছেন। সবশেষ উনি ভিডিওগুলো নষ্ট করেন।’

তিনি বলেন, ‘ভিডিও নষ্টের বিষয়টি পিবিআই পুলিশ সুপার কাজী এহসানুল কবিরের তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে। সেই প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে। মামলার পরে মেডিকেল রিপোর্টেও ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আসামি জবানবন্দিও দিয়েছে। তাহলে তো মামলার তদন্তের আর কিছু নেই। তারপরেও চার্জশিট মিলছে না। কারণ, জানতে গেলে কৃপা সিন্ধু বালার নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট নেওয়ার কথা জানানো হয় আমাদের। এটা যদি হয় তাহলে তো মামলার আর কিছুই থাকলো না। অপরাধের বিচারের কিছুই থাকবে না।’

টাকা নেওয়া ও ধর্ষণ মামলার আলামত নষ্টের অভিযোগের বিষয়ে পাবনা সদর থানার বর্তমান ওসি কৃপা সিন্ধু বালা বলেন, সব বানোয়াট, মিথ্যা। তিনি বিভিন্ন জায়গায় এমন অভিযোগ করছেন। এগুলো আমাকে হয়রানি ও সম্মানহানির জন্য করছেন।

ধর্ষণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সবুজ আলী বলেন, মামলার তদন্ত এখনো চলমান আছে। শুনেছি মামলার আসামি মুরাদুজ্জামান জামিন পেয়েছেন। তবে আমার কাছে এ সংক্রান্ত কোনো নথি নেই।

তবে ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন পিবিআই বগুড়া কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী এহসানুল কবির। তিনি বলেন, ‘উনি কী মনে করছেন তা আমি জানি না। আমি কিন্তু এমন কোনো তথ্য দিইনি, যে কৃপা সিন্ধু বালা চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হবেন না। তদন্ত এখনো চলমান। ধর্ষণের আলামত নষ্টের ঘটনায় বিভাগীয় তদন্তে আমরা কিছু পারিপার্শ্বিক প্রমাণ পেয়েছি। খুব শিগগির আমাদের তদন্ত শেষ হবে।’

ধর্ষণ মামলার আলামত ধ্বংসের অভিযোগ ও প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরেও কৃপা সিন্ধু বালা এখনো একটি থানার ওসি হিসেবে কর্মরত আছেন, এ বিষয়ে এসপি কাজী এহসানুল কবির বলেন, এটি পুলিশ হেডকোয়ার্টারের বিষয়। তারা এটি দেখবেন। তবে অভিযোগকারীরা যাতে ন্যায় বিচার পান সেটি আমরা অবশ্যই দেখব।।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ

দশ জনপ্রিয় সংবাদ